[এই লেখাটি শুধুমাত্র লেখকদের সহায়তার জন্যই লিখেছিলাম ও লেখকদের সিক্রেট গ্রুপে পোস্ট করেছিলাম। জনৈকা লেখিকার অনুরোধে এখানেও দিলাম। বস্তুতই, যারা লেখালেখি করেন তাদের অনেকের জন্যই ভবিষ্যতে এই কথাগুলো কাজে আসতে পারে]
প্রথমেই আমি স্বীকার করছি, আমি বিখ্যাত কোনো লেখক না যে অন্যদের লেখা "শিখানোর" মত যোগ্যতা বা সাহস আছে। বরঞ্চ এই গ্রুপে আমার চেয়ে অনেক পরিণত ও ভালো লেখক আছে বলেই বিশ্বাস করি। কিন্তু আমার একটা জিনিস আছে, যেটা সম্ভবত এই গ্রুপে কেন, অনেক গ্রুপেই কারো নেই। সেটা হলো বই পড়ার অভিজ্ঞতা। সেটা সংখ্যার দিক দিয়ে বা সময়ের (বছরে) দিক দিয়ে, এমনকি ভাষার (আমি চারটি ভাষায় পড়তে পারি) দিক দিয়েই হোক না কেন। লেখালেখিতেও আমি বেশ পুরানো। এবং লেখালেখি নিয়ে অন্যান্য বড় বা বিখ্যাত লেখকেরা কী বলেন, কী করেন, কীভাবে ভাল লেখা যায় ইত্যাদি বিষয় আমি অনেক আগ্রহ ও সময় নিয়ে ওয়েব থেকে নিয়মিত পড়ে থাকি। তো আমার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আমি আজকের এই লেখাটা লিখছি। বিশেষ করে গত পাঁচ/ছয় বছরে নিজের লেখা প্রকাশ ও গত তিনবছর প্রকাশনা বিষয়ে জানার চেষ্টার আলোকে এগুলো শুধুই আমার উপদেশ।
(১) শব্দের সঠিক ব্যবহার, সঠিক মেটাফোর বা রূপকের ব্যবহার একজন লেখকের লেখায় অনেক ম্যাচিউরিটি, অনেক বড় মাত্রা নিয়ে আসতে পারে। এসবের দুর্বল ব্যবহার শুধু তার দীনতাই ফুটিয়ে তোলে। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক হোন।
(২) লেখার মধ্যে অতিরিক্ত তৎসম ও কঠিন শব্দ ও মেটাফোর বা রূপকের ব্যবহার বিশেষ করে সেগুলির ভুল ব্যবহার অবশ্যই পরিত্যাজ্য। আমি নিচে আমাদের নির্বাচিত জনৈক লেখকের একটি অংশ তুলে দিচ্ছি, এটা থেকে আপনারা বুঝতে পারবেন, কতোটা বিরক্তিকর হতে পারে কারো লেখা। অথচ তিনি হয়ত ভেবেছেন (এবং এখন নিজেই দেখছেন) এটা খুব হাই-ফাই (!) সাহিত্য হয়েছে!
"... চারিদিক মুখর হয়ে আছে ঝিঝিপোকার নিরবিচ্ছিন্ন ডাকে। সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ... মাঝেমাঝে রাতের নিশুতি নীরবতাকে খণ্ডবিখণ্ড করে ভয়ঙ্কর বিশ্রী শব্দ করে কোথায় যেন ডেকে উঠছে কোনো এক নিশাচর পাখি। ... শুনতে পান হৃদয় আলোড়ন করা করুণস্বরের এই ডাক। ... যেন এই ডাক রাতের নীরবতা ভেঙে একখণ্ড ভয়ের তীর হয়ে উনার দিকে ছুটে আসে; মনে এসে ধুক করে আঘাত হানে। রাতের অখণ্ড নীরবতার সাথে পাল্লাদিয়ে উনার বুকের মধ্যে জেগে উঠছে বিন্দুবিন্দু কষ্ট। প্রথমে মনের মধ্যে গোপন কোনো সঞ্চয়কোষে তা জমা হচ্ছে তারপর ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেহে। শূন্যতাবোধে হাহাকার করছে মন।"
এটা শুধু একটা অংশ। পুরো গল্পটাতেই এসব ছিল। আর ইনি শুধু না, আরো অনেকেই আছেন যারা এধরণের ভুল শব্দ ও মেটাফোরের প্রয়োগ করেছেন, তৎসম শব্দ র্যানডম ব্যবহার করেছেন, এগুলিকে আপনি "সাহিত্য" ভাবতে পারেন, আমি মনে করি না। এটি অতি নিম্নমানের লেখা। আপনাদের কারো মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে আমরা তাকে নির্বাচন করলাম কেন? আসলে আমি একা হলে এসব লেখাগুলোকে কখনোই নির্বাচন করতাম না। আমাদের মধ্যে কয়েকজন বিচারকের কাছে সম্ভবত এসব ভালো লেগেছে (!)। তবে আমি এধরণের লেখকদের লেখার দিকে দুটি নয় দশটি চোখ খোলা রাখব, এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন।
(৩) আমাদের দেশে নবীন লেখকদের জন্য কোন আকারের বই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায়? যদিও লেখক বা লেখার মানই জনপ্রিয়তার নির্ধারক, আমার ধারনা সাত থেকে নয় ফর্মা বা ১১২ থেকে ১৪৪ পৃষ্ঠা বা ২২০০০ থেকে ৩০০০০ হাজার শব্দের বই চলে বেশি। সেজন্যই আমি বলেছি ২০০০০+ শব্দের কিছু লিখতে। আমার উপদেশ হল, লেখাটি কমপক্ষে ২২০০০ এবং সর্বোচ্চ ৩২০০০ শব্দের বেশি করবেন না।
(৪) অনেক আগে আমি একবার বলেছিলাম, ফেসবুকে প্রকাশিত লেখাও দেয়া যাবে, তবে ফেসবুক থেকে সেটাকে রিমুভ করে দিতে হবে। সেটা নির্বাচিত হওয়ার জন্য দেয়া গল্প হিসাবে ঠিক আছে। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই আমাদের মতই চাইবেন, আপনার বইটি পাঠক কিনুক ও পড়ুক। যে গল্পটা পাঠক একবার ফেসবুকে পড়েছে, সেই গল্পটা তারা কেন টাকা দিয়ে কিনে আরেকবার পড়তে চাইবে? আমাদের তরুণ তরুণীরা মোবাইলের ডাটা কিনতে, রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে কিংবা পোশাক-আসাকে দু'হাতে খরচ করেন, কিন্তু বই কেনার সময় তারা যে কতটা মিতব্যায়ী (কৃপণ বললাম না)। সেটা আমি নিজে বইমেলার স্টলে দিনের পর দিন বসে থেকে দেখেছি। তাহলে তারা এমনিতেই আপনি নতুন লেখক হিসাবে আপনার বই দশবার চিন্তা করে কিনবে, সেখানে কেনো আগে পড়া গল্পের বইটা কিনতে আগ্রহী হবে? হ্যাঁ, আপনি এবং আমরাও আপনার ফেসবুকের জনপ্রিয়তাটা কাজে লাগাবো আপনার বই প্রচারে, বলব "সেই বইপোকা গ্রুপের "আমাবশ্যার চাঁদ" উপন্যাসের লেখক খাদিমুল রাহিবের ভিন্ন মাত্রার নতুন উপন্যাস "........." পড়ে দেখুন..."
তাই আমার উপদেশ নতুন কিছু লিখুন। ফেসবুকে একটা লেখা লিখে যদি জনপ্রিয়তা অর্জন করে থাকতে পারেন, আবারও তেমন বা তার চেয়েও ভালো কিছু লেখার সামর্থ আপনার আছে।
(৫) যে কোন গল্পে বাস্তবতা বিবর্জিত কিছু লিখবেন না। গল্প বা উপন্যাস জীবনেরই চিত্র। হোক তা কাল্পনিক, কিন্তু তা বাস্তবতার বাইরে গেলে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। যেমন যদি কেউ সাইন্স ফিকশান লিখতে চান, তাকে আগে সাইন্স কী, সেটা জানতে হবে। যেমন অনেক দূরের একটা গ্রহে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা বোঝাতে কেউ যদি বলেন "মাইনাস পাঁচহাজার ডিগ্রি তাপমাত্রা", সেটা দেখে অনেকেই হাসবেন। কারণ যারা বিজ্ঞান জানেন, তারা জানেন, "অ্যাবসোলিউট যেরো" বা যেরো কেলভিন মানে ২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেঃ বা ৪৫৯.৬৭ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে ফিজিক্যাল তাপমাত্রা নামা সম্ভব নয়। একইভাবে কেউ যদি অন্য দেশের কোনো জায়গা সম্বন্ধে অনুমানে কিছু লিখে দেন, আপনাকে ধরে নিতে হবে, একহাজার পাঠকের একজন হলেও সেই জায়গা চেনেন, গিয়েছেন এমনকি ওখানেই থাকেন। অতীতের কোনো সময়ের কথা লিখতে গেলে সে সময়ের তথ্য জানা থাকতে হবে। যেমন আপনি ১৯৯৩ সালের ঘটনা লেখার সময় যদি লিখেন, "প্রেসিডেন্ট এরশাদ যখন..." সেটা অনেকেই ধরে ফেলবেন, বা ১৯৭৫ সালের ঘটনা লেখার সময় "রিক্সাওয়ালাকে দশ টাকা ধরিয়ে দিয়ে..." সেটা ঠিক হবে না। এমন হাজারটা বিষয় খেয়াল রাখা উচিৎ।
(৬) শুধুমাত্র প্রেমের গল্পই জনপ্রিয় হয়, তাই সবাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তার গল্পটিকে সেদিকেই নিয়ে যান। এটা ফেসবুকের ক্ষেত্রে সত্য হতে পারে, বইয়ের ক্ষেত্রে হবে না আমি আপনাকে কথা দিতে পারি। গল্পে জীবনের মতোই প্রেম আসবে বা থাকবে। কিন্তু সেটা মূল উপজীব্য হলে আপনার বইটি জনপ্রিয়তা পাবে না। এখন নিমাইয়ের মেমসাহেবের দিন নেই। তাই বিষয় নির্বাচনে সচেতন হোন।
(৭) আপনার বইটির প্রথম ড্রাফটটি লিখে আপনি নিজেই একবার শুধু পড়ে যান, কোনো কারেকশানের জন্য না, গল্পটার ডেভেলপমেন্টটা বোঝার জন্য। এরপরে কিছু কারেকশান দরকার হলে তা করে আপনার ঘনিষ্ট কোনো বন্ধু, যিনি আপনার লেখার সাথে পরিচিত, তাকে পড়তে দিন। এবার দুজনে আলোচনা করে গল্পটির দুর্বল দিকগুলি বের করার চেষ্টা করুন, ভালো বা শক্তিশালী দিকগুলো নয়। "দারুণ হয়েছে" শোনার জন্য না, এমনকি এরকম বলার মত বন্ধুও না। এবং তার সমালোচনা খোলা মনে গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকুন। আপনি অবাক হয়ে দেখবেন, এমন অনেক বিষয় আছে, যেগুলি আপনার চোখেই পড়েনি!
(৮) সবশেষে সিনোপসিসটির কথা আরেকবার বলছি। এটি ভালো করে লিখলে আপনি সম্পাদকীয় কমিটির নজরে পড়বেন, বেটা রিডারদের বেশি আকর্ষণ করতে পারবেন। এতে আপনারই সুবিধা। কারণ ৫১টি গল্প/উপন্যাসের প্রতিটিকে আমরা একমাসের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচজন ভিন্ন পাঠক দিয়ে পড়াবো। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমরা সেসব লেখাগুলিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে নেব, যেগুলির সিনোপসিস আমাদের বেশি ভালো লাগবে। কারণ সিনোপসিস আমাদের কমিটির সবাই (অন্তত ১০/১২ জন) পড়বে।
আজ এ পর্যন্তই। পরে এ নিয়ে আরো একবার লেখার ইচ্ছে রইল। তবে এই লেখাটির নিচে ওপেন আলোচনা হতে পারে। আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন, আপনারা মতামত দিতে পারেন বা আলোচনাও করতে পারেন। আমার সাথে একমত বা ভিন্নমত হওয়াটা জরুরী নয়। আপনারা দেখুন এ থেকে কিছু শিক্ষনীয় টিপস পাওয়া যাচ্ছে কি না, বা অন্যেরা যা বলেছে, সেটা গ্রহণীয় কি না।
আমি নহলীতে এমনভাবে ইনভলব হয়েছি যে, আমার নিজের লেখালেখি প্রায় বাদই দিয়েছি বলা যায়। আমার লেখালেখি না হয় আপনাদেরগুলি ঠিকঠাক করার পরে দেখা যাবে। আফটার অল, আপনাদের লেখাগুলিই এখন আমার লেখা হিসাবে মনে হচ্ছে আমার কাছে !
সবার জন্য অনেক শুভকামনা ❤️
প্রথমেই আমি স্বীকার করছি, আমি বিখ্যাত কোনো লেখক না যে অন্যদের লেখা "শিখানোর" মত যোগ্যতা বা সাহস আছে। বরঞ্চ এই গ্রুপে আমার চেয়ে অনেক পরিণত ও ভালো লেখক আছে বলেই বিশ্বাস করি। কিন্তু আমার একটা জিনিস আছে, যেটা সম্ভবত এই গ্রুপে কেন, অনেক গ্রুপেই কারো নেই। সেটা হলো বই পড়ার অভিজ্ঞতা। সেটা সংখ্যার দিক দিয়ে বা সময়ের (বছরে) দিক দিয়ে, এমনকি ভাষার (আমি চারটি ভাষায় পড়তে পারি) দিক দিয়েই হোক না কেন। লেখালেখিতেও আমি বেশ পুরানো। এবং লেখালেখি নিয়ে অন্যান্য বড় বা বিখ্যাত লেখকেরা কী বলেন, কী করেন, কীভাবে ভাল লেখা যায় ইত্যাদি বিষয় আমি অনেক আগ্রহ ও সময় নিয়ে ওয়েব থেকে নিয়মিত পড়ে থাকি। তো আমার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আমি আজকের এই লেখাটা লিখছি। বিশেষ করে গত পাঁচ/ছয় বছরে নিজের লেখা প্রকাশ ও গত তিনবছর প্রকাশনা বিষয়ে জানার চেষ্টার আলোকে এগুলো শুধুই আমার উপদেশ।
(১) শব্দের সঠিক ব্যবহার, সঠিক মেটাফোর বা রূপকের ব্যবহার একজন লেখকের লেখায় অনেক ম্যাচিউরিটি, অনেক বড় মাত্রা নিয়ে আসতে পারে। এসবের দুর্বল ব্যবহার শুধু তার দীনতাই ফুটিয়ে তোলে। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক হোন।
(২) লেখার মধ্যে অতিরিক্ত তৎসম ও কঠিন শব্দ ও মেটাফোর বা রূপকের ব্যবহার বিশেষ করে সেগুলির ভুল ব্যবহার অবশ্যই পরিত্যাজ্য। আমি নিচে আমাদের নির্বাচিত জনৈক লেখকের একটি অংশ তুলে দিচ্ছি, এটা থেকে আপনারা বুঝতে পারবেন, কতোটা বিরক্তিকর হতে পারে কারো লেখা। অথচ তিনি হয়ত ভেবেছেন (এবং এখন নিজেই দেখছেন) এটা খুব হাই-ফাই (!) সাহিত্য হয়েছে!
"... চারিদিক মুখর হয়ে আছে ঝিঝিপোকার নিরবিচ্ছিন্ন ডাকে। সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ... মাঝেমাঝে রাতের নিশুতি নীরবতাকে খণ্ডবিখণ্ড করে ভয়ঙ্কর বিশ্রী শব্দ করে কোথায় যেন ডেকে উঠছে কোনো এক নিশাচর পাখি। ... শুনতে পান হৃদয় আলোড়ন করা করুণস্বরের এই ডাক। ... যেন এই ডাক রাতের নীরবতা ভেঙে একখণ্ড ভয়ের তীর হয়ে উনার দিকে ছুটে আসে; মনে এসে ধুক করে আঘাত হানে। রাতের অখণ্ড নীরবতার সাথে পাল্লাদিয়ে উনার বুকের মধ্যে জেগে উঠছে বিন্দুবিন্দু কষ্ট। প্রথমে মনের মধ্যে গোপন কোনো সঞ্চয়কোষে তা জমা হচ্ছে তারপর ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেহে। শূন্যতাবোধে হাহাকার করছে মন।"
এটা শুধু একটা অংশ। পুরো গল্পটাতেই এসব ছিল। আর ইনি শুধু না, আরো অনেকেই আছেন যারা এধরণের ভুল শব্দ ও মেটাফোরের প্রয়োগ করেছেন, তৎসম শব্দ র্যানডম ব্যবহার করেছেন, এগুলিকে আপনি "সাহিত্য" ভাবতে পারেন, আমি মনে করি না। এটি অতি নিম্নমানের লেখা। আপনাদের কারো মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে আমরা তাকে নির্বাচন করলাম কেন? আসলে আমি একা হলে এসব লেখাগুলোকে কখনোই নির্বাচন করতাম না। আমাদের মধ্যে কয়েকজন বিচারকের কাছে সম্ভবত এসব ভালো লেগেছে (!)। তবে আমি এধরণের লেখকদের লেখার দিকে দুটি নয় দশটি চোখ খোলা রাখব, এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন।
(৩) আমাদের দেশে নবীন লেখকদের জন্য কোন আকারের বই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায়? যদিও লেখক বা লেখার মানই জনপ্রিয়তার নির্ধারক, আমার ধারনা সাত থেকে নয় ফর্মা বা ১১২ থেকে ১৪৪ পৃষ্ঠা বা ২২০০০ থেকে ৩০০০০ হাজার শব্দের বই চলে বেশি। সেজন্যই আমি বলেছি ২০০০০+ শব্দের কিছু লিখতে। আমার উপদেশ হল, লেখাটি কমপক্ষে ২২০০০ এবং সর্বোচ্চ ৩২০০০ শব্দের বেশি করবেন না।
(৪) অনেক আগে আমি একবার বলেছিলাম, ফেসবুকে প্রকাশিত লেখাও দেয়া যাবে, তবে ফেসবুক থেকে সেটাকে রিমুভ করে দিতে হবে। সেটা নির্বাচিত হওয়ার জন্য দেয়া গল্প হিসাবে ঠিক আছে। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই আমাদের মতই চাইবেন, আপনার বইটি পাঠক কিনুক ও পড়ুক। যে গল্পটা পাঠক একবার ফেসবুকে পড়েছে, সেই গল্পটা তারা কেন টাকা দিয়ে কিনে আরেকবার পড়তে চাইবে? আমাদের তরুণ তরুণীরা মোবাইলের ডাটা কিনতে, রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে কিংবা পোশাক-আসাকে দু'হাতে খরচ করেন, কিন্তু বই কেনার সময় তারা যে কতটা মিতব্যায়ী (কৃপণ বললাম না)। সেটা আমি নিজে বইমেলার স্টলে দিনের পর দিন বসে থেকে দেখেছি। তাহলে তারা এমনিতেই আপনি নতুন লেখক হিসাবে আপনার বই দশবার চিন্তা করে কিনবে, সেখানে কেনো আগে পড়া গল্পের বইটা কিনতে আগ্রহী হবে? হ্যাঁ, আপনি এবং আমরাও আপনার ফেসবুকের জনপ্রিয়তাটা কাজে লাগাবো আপনার বই প্রচারে, বলব "সেই বইপোকা গ্রুপের "আমাবশ্যার চাঁদ" উপন্যাসের লেখক খাদিমুল রাহিবের ভিন্ন মাত্রার নতুন উপন্যাস "........." পড়ে দেখুন..."
তাই আমার উপদেশ নতুন কিছু লিখুন। ফেসবুকে একটা লেখা লিখে যদি জনপ্রিয়তা অর্জন করে থাকতে পারেন, আবারও তেমন বা তার চেয়েও ভালো কিছু লেখার সামর্থ আপনার আছে।
(৫) যে কোন গল্পে বাস্তবতা বিবর্জিত কিছু লিখবেন না। গল্প বা উপন্যাস জীবনেরই চিত্র। হোক তা কাল্পনিক, কিন্তু তা বাস্তবতার বাইরে গেলে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। যেমন যদি কেউ সাইন্স ফিকশান লিখতে চান, তাকে আগে সাইন্স কী, সেটা জানতে হবে। যেমন অনেক দূরের একটা গ্রহে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা বোঝাতে কেউ যদি বলেন "মাইনাস পাঁচহাজার ডিগ্রি তাপমাত্রা", সেটা দেখে অনেকেই হাসবেন। কারণ যারা বিজ্ঞান জানেন, তারা জানেন, "অ্যাবসোলিউট যেরো" বা যেরো কেলভিন মানে ২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেঃ বা ৪৫৯.৬৭ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে ফিজিক্যাল তাপমাত্রা নামা সম্ভব নয়। একইভাবে কেউ যদি অন্য দেশের কোনো জায়গা সম্বন্ধে অনুমানে কিছু লিখে দেন, আপনাকে ধরে নিতে হবে, একহাজার পাঠকের একজন হলেও সেই জায়গা চেনেন, গিয়েছেন এমনকি ওখানেই থাকেন। অতীতের কোনো সময়ের কথা লিখতে গেলে সে সময়ের তথ্য জানা থাকতে হবে। যেমন আপনি ১৯৯৩ সালের ঘটনা লেখার সময় যদি লিখেন, "প্রেসিডেন্ট এরশাদ যখন..." সেটা অনেকেই ধরে ফেলবেন, বা ১৯৭৫ সালের ঘটনা লেখার সময় "রিক্সাওয়ালাকে দশ টাকা ধরিয়ে দিয়ে..." সেটা ঠিক হবে না। এমন হাজারটা বিষয় খেয়াল রাখা উচিৎ।
(৬) শুধুমাত্র প্রেমের গল্পই জনপ্রিয় হয়, তাই সবাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তার গল্পটিকে সেদিকেই নিয়ে যান। এটা ফেসবুকের ক্ষেত্রে সত্য হতে পারে, বইয়ের ক্ষেত্রে হবে না আমি আপনাকে কথা দিতে পারি। গল্পে জীবনের মতোই প্রেম আসবে বা থাকবে। কিন্তু সেটা মূল উপজীব্য হলে আপনার বইটি জনপ্রিয়তা পাবে না। এখন নিমাইয়ের মেমসাহেবের দিন নেই। তাই বিষয় নির্বাচনে সচেতন হোন।
(৭) আপনার বইটির প্রথম ড্রাফটটি লিখে আপনি নিজেই একবার শুধু পড়ে যান, কোনো কারেকশানের জন্য না, গল্পটার ডেভেলপমেন্টটা বোঝার জন্য। এরপরে কিছু কারেকশান দরকার হলে তা করে আপনার ঘনিষ্ট কোনো বন্ধু, যিনি আপনার লেখার সাথে পরিচিত, তাকে পড়তে দিন। এবার দুজনে আলোচনা করে গল্পটির দুর্বল দিকগুলি বের করার চেষ্টা করুন, ভালো বা শক্তিশালী দিকগুলো নয়। "দারুণ হয়েছে" শোনার জন্য না, এমনকি এরকম বলার মত বন্ধুও না। এবং তার সমালোচনা খোলা মনে গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকুন। আপনি অবাক হয়ে দেখবেন, এমন অনেক বিষয় আছে, যেগুলি আপনার চোখেই পড়েনি!
(৮) সবশেষে সিনোপসিসটির কথা আরেকবার বলছি। এটি ভালো করে লিখলে আপনি সম্পাদকীয় কমিটির নজরে পড়বেন, বেটা রিডারদের বেশি আকর্ষণ করতে পারবেন। এতে আপনারই সুবিধা। কারণ ৫১টি গল্প/উপন্যাসের প্রতিটিকে আমরা একমাসের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচজন ভিন্ন পাঠক দিয়ে পড়াবো। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমরা সেসব লেখাগুলিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে নেব, যেগুলির সিনোপসিস আমাদের বেশি ভালো লাগবে। কারণ সিনোপসিস আমাদের কমিটির সবাই (অন্তত ১০/১২ জন) পড়বে।
আজ এ পর্যন্তই। পরে এ নিয়ে আরো একবার লেখার ইচ্ছে রইল। তবে এই লেখাটির নিচে ওপেন আলোচনা হতে পারে। আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন, আপনারা মতামত দিতে পারেন বা আলোচনাও করতে পারেন। আমার সাথে একমত বা ভিন্নমত হওয়াটা জরুরী নয়। আপনারা দেখুন এ থেকে কিছু শিক্ষনীয় টিপস পাওয়া যাচ্ছে কি না, বা অন্যেরা যা বলেছে, সেটা গ্রহণীয় কি না।
আমি নহলীতে এমনভাবে ইনভলব হয়েছি যে, আমার নিজের লেখালেখি প্রায় বাদই দিয়েছি বলা যায়। আমার লেখালেখি না হয় আপনাদেরগুলি ঠিকঠাক করার পরে দেখা যাবে। আফটার অল, আপনাদের লেখাগুলিই এখন আমার লেখা হিসাবে মনে হচ্ছে আমার কাছে !
সবার জন্য অনেক শুভকামনা ❤️
সদস্য হতে চাই
ReplyDelete